আজ ২২শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

রংপুর অঞ্চলে খাদ্যসঙ্কটের শঙ্কা কর্মহীন শ্রমজীবীদের

মোঃ আতাউর রহমান, রংপুর জেলা প্রতিনিধি :

রংপুর অঞ্চলে খাদ্য সংকটের শঙ্কায় দিন কাটছে শ্রমজীবী মানুষের। ইতোমধ্যে সরকারিভাবে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা শুরু হলেও তা প্রয়োজনমাফিক পৌঁছেনি শ্রমজীবীদের হাতে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে করোনাভাইরাস আতঙ্কে এ অঞ্চলে ছুটে আসা দিনমজুরের আগমনে আরও বেড়েছে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা। এখন তাদের সামনে মানবেতর জীবনযাপনের হাতছানি।

 

সরকারি নির্দেশনা অনুসারে ২৫ মার্চ থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ২৬ মার্চ থেকে সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। সেই সাথে ঘর থেকে বের না হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। সে কারণে অতি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না মানুষজন। এতে করে শ্রমের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির বাজারে সবার মতো খাবার মজুদ করা সম্ভব হয়নি তাদের। তাই সরকারি সহায়তাই শ্রমজীবী মানুষের এখন একমাত্র ভরসা। সরকারি সহায়তা পৌঁছাবে কি না এ নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছে সহায়তাপ্রার্থী পরিবাগুলো।

 

রংপুর নগরীর বাহাদুর সিংহ এলাকার রিকশাচালক আজিজুল ইনলাম (৫৫)। সরকারি নির্দেশনা ও আইন শৃঙ্খখলা বাহিনীর ভয়ে রিকশা ঘর থেকে বের করতে পারেননি তিনি। কর্মহীন দিনগুলোতে তার পরিবারে চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

 

আজিজুল ইসলাম বলেন, কদিন ধরে রিকশা চালাতে পারিনি। পুলিশ, র‌্যাব রিকশা চালাতে দিচ্ছে না। এর মধ্যে খাবার জোগাড় করতে একদিন রাতে রিকশা বের করে বুড়িরহাট এলাকা থেকে কাচারী বাজারে যাই। কিন্তু শহরে কোন মানুষজন নাই। একজন মানুষ রিকশায় উঠেছিল। মাত্র ১০ টাকা ভাড়া পাই। বাড়িতে রান্না হয়নি, এখন কিভাবে দিন চলবে জানিনা।

 

মানুষ কেনাবেচার হাট বলে পরিচিত রংপুর নগরীর শিমুলবাগ এলাকায় গতকাল সোমবার সকালেও দেখা মেলে টাকার বিনিময়ে বিক্রি হতে আসা কয়েকজনের। বাসাবাড়িতে মাটি কাটিসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ পাওয়ার আশায় এখানে আসেন তারা। গঙ্গাচড়া উপজেলার ইছলী চর থেকে আসা নজম উদ্দিন (৫০) বলেন, ‘লেবারী করি হামার সংসার চলে। একদিন কাম (কাজ) না পাইলে বউ-ছাওয়া নিয়া উপাস থাকা নাগে। বাড়িভিটা, আবাদী জমি তিস্তা নদীত চলি গেইছে। করোনার জন্য সরকার কওছে ঘরোত থাইকপার। সব কাম-কাজ বন্দো হয়া গেইছে। এ্যালা হামরা কি করি খামো। এ্যালাও কায়ওতো কিছু দেয় নাই। জানেনতো বাহে ওগের (রোগ) চ্যায়া প্যাটের ভোক (ক্ষুধা) বেশি কষ্ট দেয়। ’

 

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলায় শ্রমজীবী, দিনমজুর পরিবারকে সরকারিভাবে সহায়তা দেবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রংপুর জেলায় ১৮০ মেট্রিক টন চাল, নগদ পাঁচ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলায় ৩০০ মেট্রিক টন চাল এবং চার লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দিনাজপুর জেলায় প্রায় ৩২৭ মেট্রিক টন চাল ও ১৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। লালমনিরহাট জেলায় দেড় হাজার পরিবারের মাঝে ১৫ মেট্রিক টন চাল ও পাঁচ লাখ ২৫ হাজার টাকা বিতরন করা হচ্ছে। এছাড়া প্রায় ১৯৩ মেট্রিক টন চাল ও এক লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। গাইবান্ধায় ১০০ মেট্রিক টন চাল ও পাঁচ লাখ টাকা, নীলফামারীতে ৩৩ মেট্রিক টন চাল ও সাত লাখ টাকা, ঠাকুরগাঁয়ে ২৭৭ মেট্রিক টন চাল ও নয় লাখ ৪৪ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পঞ্চগড়ে ৩০৬ পরিবারের মাঝে তিন মেট্রিক টন চাল ও এক লাখ ২৪ হাজার ৭০০ টাকা বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রায় ৯৭ মেট্রিক টন চাল, পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার ৩০০ টাকা বরাদ্দ রাখা রয়েছে।

 

রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ১০ লাখ মানুষের বসবাস রংপুর নগরীতে। যার কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ রয়েছে শ্রমজীবী। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় আমরা সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

 

রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনের সংসদ সদস্য বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, শ্রমজীবী মানুষের খাদ্য সংকট দূর করতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চাল, আলু, ডাল, তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, এটি চলবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা ও ইউপি চেয়ারম্যানগণ সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা করে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে। রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনের সংসদ সদস্য বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, শ্রমজীবি মানুষরা ঘর থেকে বের হতে পারছে না। সরকারি সাহায্য যেন শ্রমজীবিদের কাছে পৌঁছানো যায় সে লক্ষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে। নদী ভাঙনের শিকার গঙ্গাচড়াবাসীদের জন্য সরকারের কাছে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিশেষ বরাদ্দ কামনা করেন তিনি।

 

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) জাকির হোসেন বলেন, রংপুর বিভাগের আট জেলায় খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব জেলার জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের মাঝে সহায়তা বিতরণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ