আজ ১৬ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৩০শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য পিতার বুকে গুলি চালানো সেই মোসলেহ উদ্দিনকে বাংলাদেশে হস্তান্তর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বুকে গুলিবর্ষণকারী পলাতক খুনি রিসালদার (বরখাস্ত) মোসলেহ উদ্দিন ভারতে আটক হওয়ার পর তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সেদেশের গণমাধ্যম। ভারতের দুটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সীমান্তের কোনো একটি স্থলবন্দর দিয়ে গত সোমবার (২০ এপ্রিল) তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। যদিও ভারত কিংবা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মোসলেউদ্দিনকে আটক কিংবা তাকে বাংলাদেশের হস্তান্তরের ব্যাপারে এখনও কিছু বলা হয়নি।

ভারতের সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল এনডিটিভির খবরে বলা হয়, মোসলেহ উদ্দিনকে গত সোমবার সন্ধ্যায় একটি স্থলসীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ভারতের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা অভিযানটি পরিচালনা করায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সে সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি।

খবরে আরও বলা হয়, এর আগে মোসলেহ উদ্দিনের ছবি এবং ভিডিও প্রকাশিত হলে তাতে কিছু বিভ্রান্তি দেখা দেয়। ওই ছবি প্রকাশের পর বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছিল, মোসলেহ উদ্দিন কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তবে খুনি মোসলেহ উদ্দিন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অত্যন্ত সংবেদনশীল চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

এনডিটিভির খবরে উল্লেখ করা হয়, এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া বঙ্গবন্ধুর খুনি আবদুল মাজেদই রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানান। মোসলেহ উদ্দিনের গ্রেপ্তারের বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাঁচার জন্য নিজের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি

এদিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়, সম্ভবত মোসলেহ উদ্দিনকে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ পক্ষ থেকে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে অপেক্ষায় আছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের সংবাদের সূত্র মতে, মোসলেহ উদ্দিন দীর্ঘদিন গোবরডাঙ্গার ঠাকুরনগর এলাকার চাঁদপাড়া রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতেন। ওই এলাকায় তিনি ডাক্তার দত্ত নামে পরিচিত ছিলেন এবং ‘ইউনানি ফার্মেসি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে আয়ুর্বেদ ও হোমিও চিকিৎসা করতেন। ঠাকুরনগর রেলস্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের পেছনে একটি বাড়িতে তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ভারতের সংবাদমাধ্যমের শেষ খবর অনুযায়ী, দত্ত নামের যে চিকিৎসকের পরিচয়ে ছিলেন মোসলেহ উদ্দিন, তিনি গত জানুয়ারিতে মারা গেছেন। এ সময় ভারতের গোয়েন্দারা মোসলেহ উদ্দিনের ছবি সংগ্রহ করে যাচাই করে নিশ্চিত হন, তিনি চিকিৎসক দত্ত নন। এরপর গত সোমবার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে তাকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে।

তবে ঢাকায় পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, মোসলেহ উদ্দিন ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন, এমন তথ্য তাদের জানা নেই।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, আমরা সরকারিভাবে বিষয়টি জানি না। আমি আমার অফিসকে বলেছি এ বিষয়ে বিস্তারিত খবর নিতে। এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে ভারতের তরফ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানানো হচ্ছে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, সরকার নিশ্চিত হওয়ার পরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যে ছয় আসামি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন, তাদের মধ্যে মোসলেহ উদ্দিন একজন। ওই ছয়জনের মধ্যে (বরখাস্ত) ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত ১১ এপ্রিল মধ্যরাতে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের মিশনে অংশ নেয় তার মধ্যে মোসলেহ উদ্দিন অন্যতম। গুলির শব্দ শুনে বঙ্গবন্ধু যখন বিষয়টি জানার জন্য নিচে নামছিলেন সেই সময় সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুকে নিজহাতে গুলি করে হত্যা করে এই মোসলেহ উদ্দিন। ঠাণ্ডা মাথার এ খুনি জেলহত্যা মামলারও আসামি। এরপর অন্য খুনিদের সাথে তিনিও বঙ্গভবনে দায়িত্বপালন করেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তাকে তেহরান ও জেদ্দা দূতাবাসে দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। তখন দেশে তিনি দুই-একবার আসেন বলেও জানা গেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অন্য খুনিদের সাথে তিনিও দেশ ছেড়ে থাইল্যান্ড হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান। এরপর জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। কয়েক বছর পর যান ভারতে। সেখানে উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠাকুরনগর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

মোসলেউদ্দিন গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা সত্য হলে এখন বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার খুনি পলাতক থাকলেন। তারা হলেন খন্দকার আবদুর রশীদ, শরিফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী ও এ এম রাশেদ চৌধুরী। তারা সবাই সাবেক সেনা কর্মকর্তা। এ ছাড়া খুনিদের মধ্যে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে সৈয়দ ফারুক রহমান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও মুহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ওই রায় কার্যকরের আগেই ২০০২ সালে পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা যান আসামি আজিজ পাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ